উপন্যাস (সংজ্ঞা ও গঠনকৌশল), বাংলা ও বাংলাদেশের উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

উপন্যাস (সংজ্ঞা ও গঠনকৌশল), বাংলা ও বাংলাদেশের উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

উপন্যাস (ধারণা ও সংজ্ঞা, আলিক ও গঠনকৌশল), বাংলা ও বাংলাদেশের উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, কাকতাড়ুয়া উপন্যাস ও ঔপন্যাসিক পরিচিতি: সেলিনা হােসেন এবং এই উপন্যাসের আলােচনা।

ক. উপন্যাসের ধারণা ও সংজ্ঞা

উপন্যাস গদ্যে লেখা এক ধরনের গল্প। মানুষ গল্প বলতে ভালােবাসে। সুপ্রাচীনকাল থেকেই এটা চলে আসছে। মানুষ তখন মুখে মুখে গল্প বলত। লিখে রাখার চল ছিল না। পরে এরই ধারাবাহিকতায় আবির্ভাব ঘটে উপন্যাসের। তবে উপন্যাস শুধু চোখে দেখা গল্প নয়, এ হচ্ছে এক ধরনের সৃষ্টিশীল রচনা। মানুষের জীবনই হচ্ছে উপন্যাসের উৎস। এই জীবনে যেসব ঘটনা ঘটে, সেই সব ঘটনার সঙ্গে লেখকেরা নিজের ভাবনা, কল্পনাকে মিশিয়ে দিয়ে রচনা করেন উপন্যাস। উপন্যাসে তাই আমরা পাই ঔপন্যাসিকের জীবনানুভূতির প্রকাশ। এভাবেই উপন্যাস হয়ে উঠেছে এক ধরনের সৃষ্টিশীল রচনা। মানুষ এরপর যখন লিখে রাখতে শেখে, তখনই আবির্ভাব ঘটে উপন্যাসের। পনেরাে শতকে ছাপাখানার আবির্ভাবের পর বিলুপ্তি ঘটে গল্পকথকদের। শুরু হয় আধুনিক উপন্যাসের কাল। প্রথমে এই আধুনিক উপন্যাসের সূত্রপাত ঘটে ইউরােপে, পরে তা ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। শুরু হয় আধুনিক উপন্যাস লেখা।

শুরুতেই বলেছি, উপন্যাসে থাকে একটি প্রধান বা মূল গল্প। এই গল্পটিকে গড়ে তােলার জন্যে থাকতে পারে আরও কিছু পাগল্প। ফলে, উপন্যাসের আকার সাধারণত ছােট হয় না, আবার এটি নিতান্ত ছােট গল্পও নয়। তবে এর আকার কতটুকু হবে, মূল গল্পটি গড়ে তুলতে গিয়ে পার্শ্বগল্পের আশ্রয় নেওয়া হবে কি না, এ বিষয়ে সাহিত্য তাত্ত্বিকগণ একমত হতে পারেন নি। ই. এম. ফস্টার তাঁর আসপেক্ট অব দ্য নভেল গ্রন্থে বলেছেন, উপন্যাস হচ্ছে সুনির্দিষ্ট আয়তনের গদ্যকাহিনি (prose of a certain extent)। এই আয়তনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, উপন্যাসের শব্দসংখ্যা কমপক্ষে পঁচিশ হাজার হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে এর সর্বোচ্চ সংখ্যা কত হবে, ফস্টার সে সম্পর্কে কিছু বলেন নি। প্রখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল পুস্তের লেখা একটি উপন্যাসের (In Search of Lost Time) শব্দসংখ্যা বারাে লাখের মতাে। এটিই এ পর্যন্ত লেখা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উপন্যাস। লেভ তলস্তয়ের ওয়ার অ্যান্ড পিসের শব্দসংখ্যাও অনেক – পাঁচ লাখ সাতাশি হাজারের মতাে। ইতালির বিখ্যাত নন্দনতাত্ত্বিক ও ঔপন্যাসিক উমবার্তো একো আবার সাত শব্দের এক বাক্যে রচিত একটি লেখাকে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম উপন্যাস বলে দাবি করেছেন। শুধু আকার নয়, উপন্যাসের প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধেও সাহিত্য তাত্ত্বিকগণ একমত হতে পারেন নি। এর কাহিনি কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, কাহিনির বিষয়-আশয় কী হবে, ভাষারীতির ধরন কেমন হবে- এসব বিষয়ে সাহিত্য তাত্ত্বিকগণ নিজেদের স্বাতন্ত্র প্রকাশের জন্য আলাদা আলাদা পথ বেছে নিয়েছেন।

তবে এসব পার্থক্য সত্ত্বেও কিছু কিছু বিষয়ে যে মিল নেই, এমন নয়। এমন সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণেই উপন্যাস বিশেষ এক ধরনের সৃষ্টিশীল রচনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। যেমন, ঔপন্যাসিক যে গল্পটি নির্মাণ করেন, সেটি নির্মাণ করা হয় বর্ণনার সাহায্যে। গদ্য আর সংলাপের মাধ্যমে। উপন্যাসের এই বর্ণনাকে বলে ন্যারেটিভ (Narrative)। সুবিন্যস্তভাবে এর কাহিনিকে উপন্যাসে তুলে ধরা হয়। বাংলায় ব্যবহৃত উপন্যাস’ শব্দটির মধ্যেও এই বিন্যাসের কথা আছে। উপ’ উপসর্গের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ন্যাস’। এই ন্যাসই হচ্ছে বিন্যাস। বাংলায় ব্যবহৃত এই শব্দটির সংস্কৃত ব্যুৎপত্তি হচ্ছে এরকম: উপ+নি+অস+অ= উপন্যাস। ইংরেজিতে এর দুটি প্রতিশব্দ আছে: Novel, Fiction। নভেল শব্দটি এসেছে ইতালির novella থেকে। এর অর্থ: ale (গল্প) বা কাহিনি। ফিকশনের উৎস হচ্ছে fact (ঘটনা) বা গল্প।

উপন্যাসের কয়েকটি সংজ্ঞা

সাহিত্যের বিশেষ রূপ হিসেবে উপন্যাসের সংজ্ঞা দেওয়া খুব সহজ নয়। এর আকার আর প্রকৃতি নিয়ে আছে ভিন্নমত। ফলে এর সুনির্দিষ্ট কোনাে সংজ্ঞা দেওয়া কঠিন। তবু এর সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে উপন্যাসের যেসব সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে সেগুলাে এ রকম:

  • গ্রন্থকারের ব্যক্তিগত জীবন-দর্শন ও জীবনানুভূতি কোনাে বাস্তব কাহিনি অবলম্বন করিয়া যে বর্ণনাত্মক শিল্পকর্মে রূপায়িত হয়, তাহাকে উপন্যাস কহে। [উপন্যাস’, সাহিত্য-সন্দর্শন, শ্রীশচন্দ্র দাস, কথাকলি, ঢাকা, ১৯৭৬]
  • ইংরেজিতে ‘নভেল’ এক বিশেষ ধরনের সাহিত্য-সংরূপ। গদ্যে লেখা সুদীর্ঘ বর্ণনাত্মক সাহিত্যকর্ম। [উপন্যাস’, সাহিত্য শব্দার্থকোষ, সুরভি বন্দ্যোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা, ১৯৯৯, পৃ. ২৯।]
  • An invented prose narrative of considerable length and a certain complexity that deals imaginatively with human experience, usually through a connected sequence of events involving a group of persons in a specific setting, is called a novel. [The Britannica Guide to Literary Elements: Prose Literary Terms and Concepts, Ed. by Kathleen Kuiper, Britannica Educational Publishing, New York, 2012, p. 1.]
  • The term “novel” is now applied to a great variety of writings that have in common only the attribute of being extended works of fiction written in prose. (“Novel’, A Glossary of Literary Terms (9th. Edition), M. H. Abrams and Geoffrey Galt Harpham, Wadsworth Cengage Learning, Boston, 2009, p. 226.]

সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালােচনা করলে দেখা যাবে, উপন্যাস হচ্ছে অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালের সৃষ্টি। সাহিত্যের আদিরূপ হিসেবে প্রথমে সৃষ্টি হয়েছিল কবিতা, মহাকাব্য, আখ্যানকাব্য। পরে মানুষের জীবন জটিল হয়ে উঠতে থাকলে আবির্ভাব ঘটে উপন্যাসের। নিজের কথা, চারপাশের মানুষের কথা, সমাজের কথা বলার তাগিদ থেকেই কাহিনির আশ্রয় নেন লেখকো। রচনা করতে থাকেন উপন্যাস। উপন্যাসে তাই লেখকের জীবনদর্শন ও জীবনবােধের প্রকাশ লক্ষ করি আমরা। জীবনের সমগ্রতাই প্রতিফলিত হয় উপন্যাসে। এটাই হচ্ছে উপন্যাসের মর্মকথা। সতেরাে শতকের হিস্পানি ঔপন্যাসিক সার্ভেন্তাসের ডন কিহােততা থেকে আধুনিককালের এই বােধেই। পৌছেছেন ঔপন্যাসিকো।

খ. উপন্যাসের আলিক ও গঠনকৌশল

উপন্যাসের কাহিনি কীভাবে গড়ে তােলা হবে, সেটাই হচ্ছে উপন্যাসের আঙ্গিক ও গঠনকৌশলের দিক। প্রায় চার শত বছর ধরে নানা চর্চার মধ্য দিয়ে সাধারণভাবে উপন্যাস যেসব উপাদানের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে সেগুলাে নিম্নরূপ:

১. কাহিনি বা আখ্যানভাগ (plot)

২. চরিত্র (character)

৩. দৃশ্য/পরিবেশ (scene or setting)

৪. বর্ণনাভঙ্গি (narrative method)

৫. ভাষা (diction) এবং

৬. ঔপন্যাসিকের জীবনভাবনা (Author’s philosophy)।

উপন্যাসের প্রধান উপাদান এর কাহিনি বা গল্প। এই কাহিনি হতে পারে, সরল আবার জটিল। নিরীক্ষাধর্মী উপন্যাসে দেখা যায়, গল্পের প্রাধান্য তেমন থাকে না। ভাষা বা বলার ভঙ্গিটাই প্রধান হয়ে ওঠে। অ্যাবসার্ড উপন্যাস কিংবা ফরাসি নব্য (nouveau) উপন্যাস এভাবেই লেখা হয়েছে। তবে সাধারণভাবে কতগুলাে ছােট ছােট বা উপকাহিনির সাহায্যে উপন্যাসের কাহিনি গড়ে তােলা হয়। উপন্যাসে উপস্থাপিত এই কাহিনিকে বলা হয় আখ্যানভাগ (plot) বা কাহিনি-সমগ্র।

উপন্যাসের দ্বিতীয় উপাদান চরিত্র। চরিত্রের আচার-আচরণ ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে উপন্যাস। উপন্যাসে এক বা একাধিক চরিত্র থাকে। এর কোনটি হবে প্রধান চরিত্র, বা আদৌ কোনাে প্রধান চরিত্র থাকবে কি না, সেসব নির্ভর করে ঔপন্যাসিকের ওপর। চরিত্রগুলাে যেসব ঘটনা ঘটায় তার মধ্য দিয়েই উপন্যাসের কাহিনি অগ্রসর হতে থাকে। চরিত্রের বিকাশের মধ্য দিয়ে উপন্যাসের কাহিনিও বিকশিত হয়। উপন্যাস পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। উপন্যাস হচ্ছে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই ক্রমবিকশিত চরিত্রেরই কাহিনি।

উপন্যাসের আরেকটি উপাদান হচ্ছে এর নানান দৃশ্য বা পরিবেশ। বিভিন্ন টুকরাে টুকরাে দৃশ্য বা পরিবেশের সমন্বয়েই উপন্যাসের কাহিনিকে গেঁথে তােলেন ঔপন্যাসিক। চরিত্রের মনােভাব এবং আচার-আচরণের গতিপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করেই গড়ে ওঠে এই পরিবেশ। বর্ণনারীতি হচ্ছে উপন্যাসের আরেকটি উপাদান। উপন্যাসে আমরা যে দৃশ্য, পরিবেশ বা কাহিনির কথা পাই তা বিভিন্ন ভঙ্গির সাহায্যে নির্মাণ করা হয়। কোথাও চরিত্র নিজের ভাষায় নিজের গল্প বলে, কোথাও ঔপন্যাসিক উপন্যাসের কাহিনি বর্ণনা করেন। কোথাও থাকে শুধুই তথ্য, কোথাও ঔপন্যাসিক আবেগময় কাব্যিক ভাষায় কাহিনির কাঠামাে গড়ে তােলেন। সেদিক থেকে দেখলে ভাষা হচ্ছে উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কেননা, উপন্যাস লেখা হয় ভাষার মাধ্যমে। ভাষা দিয়েই বর্ণনা করা হয় সবকিছু। সৃষ্টি করা হয় বিশেষ বিশেষ পরিবেশ। যথাযথ স্থানে যথার্থ ভাষার ব্যবহার না থাকলে উপন্যাস হয়ে ওঠে না। তবে উপন্যাসের সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করে লেখকের জীবনভাবনা বা জীবনদর্শন। লেখকের বলা কথাটিই হচ্ছে তাঁর জীবনদর্শন। শেষ পর্যন্ত আমরা একটি উপন্যাসের কাহিনিতে এই জীবনদর্শনই প্রতিফলিত হতে দেখি। সামগ্রিকভাবে বললে, উল্লিখিত সবগুলাে উপাদান মিলিয়েই লেখা হয় উপন্যাস।

গ. বাংলা উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

আগেই বলেছি, উপন্যাস আধুনিক কালের সৃষ্টি। বাংলা সাহিত্যে মাত্র দেড় শত বছর আগে ইংরেজি উপন্যাসের আদলে উপন্যাস রচনার সূত্রপাত ঘটে। তবে অনেকেই এর বীজ খুঁজে পেয়েছেন প্রাচীন সংস্কৃত কাহিনি-কাব্য, পঞ্চতন্ত্র ও বৌদ্ধ জাতকের গল্প, মধ্যযুগের রূপকথা, ময়মনসিংহ গীতিকা, রােমান্টিক কাহিনি-কাব্য, নাথ সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য, আরব্য উপন্যাস, লােকগাথা প্রভৃতি রচনায়। এভাবে দেখলে, আধুনিক কালের পূর্বে বাংলা উপন্যাসের কোনাে নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের সূত্রপাত ঘটলে কলকাতাকে কেন্দ্র করে একদিকে ব্যাপক নগরায়ণ, অন্যদিকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে। ইউরােপীয় শিক্ষার প্রভাবে মানবিকতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র, শিক্ষা ও সাময়িক পত্রের প্রসার, সমাজ সচেতনতা ইত্যাদি বৃদ্ধি পায়। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের দ্বারা সমাজ ক্রমশ জটিল হয়ে পড়ে। নতুন কালের মানুষ নতুন সমাজের কথা প্রকাশের গরজ অনুভব করতে থাকে। এরই প্রভাবে উদ্ভব ঘটে উপন্যাসের।

অনেকে মনে করেন,হানা ক্যাথারিন মুলেন্সের (১৮২৬-৬১) লেখা ফুলমনি ও করুণার বিবরণ (১৮৫২) হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস। কেউ কেউ আবার প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল(১৮৫৮) এর মধ্যে উপন্যাসের লক্ষণ খুঁজে পেয়েছেন। তবে সবাই মেনে নিয়েছেন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-৯৪) দুর্গেশ নন্দিনী (১৮৬৫) হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস। বঙ্কিমচন্দ্রই প্রকৃতপক্ষে আধুনিক বাংলা উপন্যাসের স্রষ্টা। উপন্যাসের সমস্ত লক্ষণ তাঁর উপন্যাসে দেখা যাবে। তিনি ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছেন। লিখেছেন সামাজিক উপন্যাস। সমাজের নানা অসংগতি, ব্যক্তির কামনা, বাসনা, বেদনা ও দ্বন্দ্বের কথা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে তাঁর উপন্যাসে। কাহিনি বর্ণনা, চরিত্রচিত্রণ, ভাষা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও তিনি সাফল্য দেখিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযােগ্য উপন্যাসগুলাে হচ্ছে কপালকুণ্ডলা, বিষবৃক্ষ, কৃষ্ণকান্তের উইল ইত্যাদি।

বাংলা উপন্যাসের আরেক কীর্তিমান লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। উপন্যাস রচনাতেও তাঁর সাফল্য ঈর্ষণীয়। ব্যক্তির মন ও মননের অপূর্ব সমন্বয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপন্যাসগুলাে রচনা করেছেন। বঙ্কিমের উপন্যাসে আমরা দেখেছি সমাজের চাপে ব্যক্তি আত্মপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে নি। তার চত্রিরগুলাে সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হয়েছে। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে পাওয়া গেল নতুন কালের নারী ও পুরুষকে। মানবিকতার দ্বারা দীক্ষিত হয়ে তারা সামাজিক সংস্কারকে অস্বীকার করছে। নারী-পুরুষের সমানাধিকারের ভিত্তিতে অর্জন করতে চাইছে আত্মপ্রতিষ্ঠা। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে চাইছে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান। কাহিনি নির্মাণ, চরিত্র চিত্রণ, ভাষার নিরীক্ষা, যুগের প্রতিফলন, মনােবিশ্লেষণ ইত্যাদি দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসগুলাে উল্লেখযােগ্য। তাঁর লেখা বহুল আলােচিত উপন্যাসগুলাে হচ্ছে চোখের বালি, গােরা, ঘরে বাইরে, চার অধ্যায় ও যােগাযােগ।

রবীন্দ্রনাথের পরে বাঙালির গৃহকাতরতা এবং আবহমান পারিবারিক আবেগের ওপর ভর করে উপন্যাস লিখেছেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮)। অর্জন করেছিলেন ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা। তাঁর উল্লেখযােগ্য উপন্যাসগুলাে হচ্ছে চরিত্রহীন, গৃহদাহ, দেবদাস, দেনা-পাওনা, শ্রীকান্ত ইত্যাদি।

বাংলা উপন্যাসের জগতে এরপর আবির্ভাব ঘটে তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের- তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১), বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০) এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৯০৮-১৯৫৬)। আবহমান বাংলার প্রাকৃতিক মাধুর্য, পল্লির স্নিগ্ধ শান্ত রূপ, অরণ্য, পাহাড় যে এখনাে আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, তার লেখা পথের পাঁচালী, অপরাজিতা, আরণ্যক ইত্যাদি উপন্যাস পড়লেই তা বােঝা যায়। তারাশঙ্করের উপন্যাসে পাই অতীতের গৌরব আর ঐশ্বর্য হারানাে জমিদার, নিম্নশ্রেণির বিচিত্র পেশার সাধারণ মানুষের কথা। এই মানুষজন আমাদের চিরচেনা বৈষ্ণবী, কবিয়াল, যাত্রাশিল্পী, মৃৎশিল্পী, বেদে, সাপুড়ে, বাজিকর, ঝুমুর দলের নাচিয়ে ইত্যাদি। উঠতি শিল্পমালিক আর শ্রমিকদের জীবনের ছবিও পাওয়া যাবে তাঁর উপন্যাসে। তাঁর উল্লেখযােগ্য উপন্যাসগুলাে হচ্ছে- গণদেবতা, পঞ্চগ্রাম, ধাত্রীদেবতা, হাসুলী বাঁকের উপকথা, কবি প্রভৃতি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসের প্রধান দুটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে: (১) মার্কসবাদের পটভূমিতে ধনী-দরিদ্রের দ্বন্দ্ব এবং (২) ফ্রয়েডীয় মনােবিশ্লেষণের আলােকে নর-নারীর জটিল সম্পর্ককে তিনি উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। ঔপনিবেশিক শাসনের দ্বারা জর্জরিত মানুষের জীবনের ছবি তার উপন্যাসে উজ্জ্বল। সেই সঙ্গে পাওয়া যাবে গ্রামীণ বাস্তবতার চিত্র। দিবারাত্রির কাব্য, পদ্মানদীর মাঝি, পুতুল নাচের ইতিকথা, চিহ্ন শহরতলী প্রভৃতি তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস। বাংলা উপন্যাস আরও যারা লিখে খ্যাতিমান হয়েছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য হচ্ছেন: জগদীশ গুপ্ত, সতীনাথ ভাদুড়ী, কমলকুমার মজুমদার, দেবেশ রায়, মহাশ্বেতা দেবী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখখাপাধ্যায় প্রমুখ।

ঘ. বাংলাদেশের উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

১৯৪৭ সালে রাজনৈতিকভাবে ভারত বিভক্ত হয়ে যায়। পূর্ব বাংলায় সূচনা ঘটে নতুন এক সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থার। এই সময়েই যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশের উপন্যাসের। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এই অঞ্চলটি ছিল পাকিস্তানের উপনিবেশ। ঢাকাকে কেন্দ্র করে নাগরিক জীবনের আবির্ভাব ঘটলেও গ্রামীণ জীবন ছিল একই রকম। ধনী-দরিদ্রের দ্বন্দ্ব, গ্রামীণ কুসংস্কার, দারিদ্র্য ইত্যাদির দ্বারা বিপন্ন হয়ে পড়েছিল মানুষের জীবন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ অর্জন করে স্বাধীনতা। জাতীয় জীবনে দেখা দেয় নতুন উদ্দীপনা। জনজীবনে আধুনিকতার ছোঁয়া যেমন লাগে, তেমনি গ্রামীণ জীবনের টানও ছিল সমান। এই পটভূমিতে বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকেরা লিখেছেন নানা ধরনের উপন্যাস। শ্রেণিকরণ করলে বাংলাদেশের উপন্যাসকে এভাবে বিন্যস্ত করা যেতে পারে:

(১) গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত উপন্যাস: সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র লালসালু, কাঁদো নদী কাঁদো, চাঁদের অমাবস্যা, আবু ইসহাকের সূর্য-দীঘল বাড়ি, জহির রায়হানের হাজার বছর ধরে, আবদুল গাফফার চৌধুরীর চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান, শওকত ওসমানের জননী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খােয়াবনামা, হাসান আজিজুল হকের আগুনপাখি, সৈয়দ শামসুল হকের মহাশূন্যে পরান মাস্টার, সেলিনা হােসেনের দীপান্বিতা ইত্যাদি।

(২) নগর ও গ্রামের পটভূমিতে রচিত উপন্যাস: আলাউদ্দিন আল আজাদের ক্ষুধা ও আশা, শহীদুল্লাহ কায়সারের সংশপ্তক, সরদার জয়েন উদ্দিনের অনেক সূর্যের আশা, আবুল ফজলের রাঙাপ্রভাত, আনােয়ার পাশার নীড় সন্ধানী ইত্যাদি।

(৩) নগর জীবনের পটভূমিতে রচিত উপন্যাস: আবুল ফজলের জীবন পথের যাত্রী, রশীদ করীমের উত্তম পুরুষ ও প্রেম একটি লাল গােলাপ, আবু রুশদের সামনে নতুন দিন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাই, শওকত আলীর দক্ষিণায়নের দিন ইত্যাদি।

(৪) আঞ্চলিক ও বিশেষ জীবনধারার উপন্যাস: আলাউদ্দিন আল আজাদের কর্ণফুলি, শহীদুল্লাহ কায়সারের সারেং বউ, শামসুদ্দীন আবুল কালামের কাশবনের কন্যা, আবু ইসহাকের পদ্মার পলি, সরদার জয়েনউদ্দিনের পান্নামতি, শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন, সেলিনা হােসেনের পােকামাকড়ের ঘরবসতি ইত্যাদি।

(৫) মনস্তত্ত্ব ও দার্শনিক উপন্যাস: আলাউদ্দিন আল আজাদের তেইশ নম্বর তৈলচিত্র, সৈয়দ শামসুল হকের দেয়ালের দেশ ও এক মহিলার ছবি, শওকত আলীর পিঙ্গল আকাশ, মাহমুদুল হকের খেলাঘর ইত্যাদি।

(৬) ঐতিহাসিক ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস: আবু জাফর শামসুদ্দিনের ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান ও পদ্মা মেঘনা যমুনা, শামসুদ্দীন আবুল কালামের আলম গড়ের উপকথা, সত্যেন সেনের অভিশপ্ত নগরী, আনােয়ার পাশার রাইফেল রােটি আওরাত, শওকত ওসমানের জলাঙ্গী, রিজিয়া রহমানের বং থেকে বাংলা, মাহমুদুল হকের জীবন আমার বােন, হাসান আজিজুল হকের বিধবাদের কথা, সেলিনা হােসেনের হাঙর নদী গ্রেনেড ও গায়ত্রী সন্ধ্যা, হুমায়ুন আহমেদের আগুনের পরশমনি, জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প, দেয়াল ইত্যাদি।

এই বিভাজন ছাড়াও বয়সভেদে নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে উপন্যাস রচনা করেছেন বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকেরা। ফলে তারা যেমন বড়দের জন্য উপন্যাস লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন ছােটদের জন্যও।

     সব মিলিয়ে বলা যায়, বিচিত্র ধারায় বাংলাদেশের উপন্যাস বিকশিত হয়েছে। গ্রামীণ মানুষের জীবন ও শহুরে জীবন, ব্যক্তিক সংগ্রাম ও জাতিগত সগ্রাম, ইতিহাস ও রাজনীতি-সবকিছুই বাংলাদেশের উপন্যাসে স্থান পেয়েছে। চরিত্রচিত্ৰণ, ভাষা, আখ্যানশৈলী ইত্যাদি নানা দিক থেকে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকেরা।

ঙ. কাকতাড়ুয়া উপন্যাস ও ঔপন্যাসিক পরিচিতি: সেলিনা হােসেন

সেলিনা হােসেন ১৯৪৭ সালের ১৪ জুন রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মােশাররফ হােসেন, মাতার নাম মরিয়মন্নেসা বকুল। তিনি পিতামাতার চতুর্থ সন্তান। ১৯৬০-এর দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে লেখালেখির সূচনা। এ পর্যন্ত বড়দের জন্য তাঁর প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা তেত্রিশ, ছােটদের পঁচিশ। সেলিনা হােসেনের লেখার জগৎ বাংলাদেশের মানুষ, তার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। তাঁর উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে সমকালের সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংকটের সামগ্রিকতা। বাঙালির অহঙ্কার ভাষা-আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তার লেখায় নতুন মাত্রা অর্জন করেছে। ইংরেজি, রুশ, ফরাসি, হিন্দি, জাপানি, কোরিয়ান, ফিনিশ, উর্দু, আরবি, মালে, মালায়লাম ইত্যাদি বেশ কয়েকটি ভাষায় তার বেশ কিছু গল্প ও উপন্যাস অনূদিত হয়েছে। বিদেশি বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তার উপন্যাস পাঠ্যসূচিভুক্ত হয়েছে। তাঁর উল্লেখযােগ্য উপন্যাসগুলাে হচ্ছে: হাঙর নদী গ্রেনেড, পােকামাকড়ের ঘরবসতি, নীল ময়ূরের যৌবন, গায়ত্রী সন্ধ্যা, পূর্ণছবির মগ্নতা, যমুনা নদীর মুশায়েরা, ভূমি ও কুসুম। একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ পেয়েছেন দেশের প্রধান প্রধান সব পুরস্কার। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন সুরমা চৌধুরী আন্তর্জাতিক স্মৃতি পুরস্কার (ভারত)। ২০১০ কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডিলিট উপাধিতে ভূষিত করে। কর্মজীবনে তিনি বাংলা একাডেমির পরিচালক ছিলেন। ২০১৮ সালে তিনি স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন। এখন সার্বক্ষণিকভাবে লেখালেখি, নারী উন্নয়ন আর মানবাধিকার নিয়ে কাজ করছেন।

উপন্যাসের আলােচনা: কাকতাড়ুয়া

বাংলাদেশের কোনাে একটি গ্রাম। এই গ্রামেরই এক কিশাের বুধা। এক চাচি আর চাচাতাে বােন কুন্তি ছাড়া তিন কুলে আপন বলতে কেউ নেই। তবে আজ না থাকলেও একদিন ছিল। সে বছর দুয়েক আগের কথা। বাবা-মা ছাড়াও ছিল দুই বােন আর এক ভাই। সবচেয়ে ছােট বােন বিনুর বয়স ছিল দেড় বছর। ছিল পিঠাপিঠি এক ভাই তালেব আর বােন শিলু। এই ভাই-বােনদের নিয়ে ভালােই কাটছিল তার দিনগুলাে।কিন্তু একরাতে সব শেষ হয়ে গেল। কলেরায় মারা গেল সবাই। ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেল বুধা। চাচির বাড়িতে প্রথমে আশ্রয় মিলেছিল। কিন্তু দারিদ্র্যের কথা তুললে বুধা সেই বাড়ি ত্যাগ করে। সেই থেকে বুধা একা। যখন যেখানে খুশি রাত কাটায়। যা খুশি তাই করে। যখন যা জোটে তাই দিয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করে।

পুরাে গ্রাম আর হাটবাজার হয়ে উঠল তার বিচরণক্ষেত্র। চেনাজানা সব মানুষ হয়ে উঠল তার আপনজন। এভাবে দিন যায়, দিন আসে। কিন্তু একদিন ঐ গ্রামে মিলিটারি ঢুকে পড়ল। পুড়িয়ে দিল বাজারের দোকানপাট। বিস্মিত বুধা, কেন মিলিটারিরা এমন করল? কী এমন অপরাধ করেছে বাংলাদেশের মানুষ? ভীষণ ক্ষুব্ধ হলাে সে। ভাবল,এর প্রতিকার হওয়া দরকার। প্রতিশােধ নেওয়া দরকার। বুঝতে তার অসুবিধা হলাে না, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ কী, তা সে বােঝেই না। তবে এটা বুঝেছিল, ঐ মিলিটারিরা বিদেশি। বাংলাদেশের মানুষ নয়। এদের বিরুদ্ধে লড়াই করা জরুরি। শুধু এরা নয়, যারা এদের সহায়তা করছে, তাদের বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হবে। অন্যদের মতাে গ্রাম ছেড়ে সে পালিয়ে যাবে না। কিন্তু সে তাে খুব ছােট, যুদ্ধ করবে কী করে?

এক রাতে মুক্তিযােদ্ধা আলি ও মিঠু রাতের আঁধারে গ্রামে এলাে। বুধাকে বলল স্কুলের মিলিটারি ক্যাম্পটা উড়িয়ে দিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়লাে বুধা। প্রথমে পুড়িয়ে দিল শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আহাদ মুন্সির বাড়ি। তারপর রাজাকার কমান্ডারের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিল। বাপ-মা হারানাে কিশাের বলে কেউ তাকে তেমন একটা সন্দেহ করল না। তারপর এলাে সেই দিন। মুক্তিযােদ্ধাদের নেতা শিল্পী শাহাবুদ্দিন তাকে মাইন পেতে ক্যাম্পটা উড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব দিলেন। বাঙ্কার ঘোড়বার সময় কৌশলে সে তার ভেতর মাইন পুঁতে চলে এলাে নদীর ধারে। এখানেই অপেক্ষা করছিলেন শাহাবুদ্দিন এবং তার সহযােদ্ধারা। এলাে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। পাকিস্তানি সেনারা বাঙ্কারে ঢুকতেই পুরাে ক্যাম্পটা মাইনের বিস্ফোরণে উড়ে গেল। নদীতে নৌকায় বসে শাহাবুদ্দিন, বুধা শুনতে পেল সেই শব্দ। তাদের অভিযান সফল হলাে। নৌকা সরে গেল নিরাপদ দূরত্বে। সংক্ষেপে এই হচ্ছে কাকতাড়ুয়া উপন্যাসের কাহিনি। এক সাহসী কিশাের মুক্তিযােদ্ধার কাহিনি।

আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না, উপন্যাসটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত। এর আখ্যানভাগ বা প্লটটিকে চমৎকারভাবে গড়ে তুলেছেন সেলিনা হােসেন। শুরুটা এ রকম:

রাত পােহালে দিনের আলাে, সুয্যি ডুবলে আঁধার। ওর কাছে দুটোই সমান। হাটে-মাঠে ঘুরে বেড়ায়। ঘুরতে ঘুরতে যে কোথায় যায় সে হিসেব রাখে না। ওর কাছে পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ সব সমান। মনে করে যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই ওর জন্যে রাস্তা খােলা।

এই হচ্ছে কাকতাড়ুয়া উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বুধার কথা। এরপর বুধার চরিত্রটিকে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন সেলিনা হােসেন। বুধা কিশাের হলেও অসীম সাহস আর মানবিক গুণাবলির অধিকারী সে। দেশের মানুষের প্রতি মমতুবােধ, বিদেশি মিলিটারিদের প্রতি ঘৃণা, দেশাত্মবােধ তার চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। খুবই স্বাভাবিক মনে হয় তার এই আচার-আচরণ। দেশকে ভালােবাসে বলে ধীরে ধীরে সে মুক্তিযােদ্ধা হয়ে ওঠে। সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশপ্রেমের এক অনবদ্য কাহিনী এটি। ঔপন্যাসিক এর চরিত্রগুলােকে, বিশেষ করে বুধার চরিত্রটি এ লক্ষ্যেই গড়ে তুলেছেন।

কাকতাড়ুয়া উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বুধা। বুধাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এর কাহিনি। সে কিশাের কিন্তু ভীষণ সাহসী। ছেলেবেলায় সে ভয়ের গল্প শােনেনি। ভয় কী,তা-ই সে জানে না। বাবা-মা, ভাই-বােন মারা যাওয়ার কথা মনে হলে তার আর ভয় থাকে না। গাঁয়ের লােক তাকে পাগল বললেও সে আসলে এক সাহসী বালক। একা একা বেড়ে উঠতে গিয়ে সে আরও সাহসী হয়ে ওঠে। চাচির বাড়ি ছেড়ে এলে তার মধ্যে মুক্তির বােধ জাগে। একা একা থাকতে থাকতে সে স্বাধীন মানুষ হিসেবে বড় হতে থাকে। ঔপন্যাসিক এভাবেই ভয়হীন এক কিশাের হিসেবে তাকে গড়ে তুলেছেন। এর পরই সে জড়িয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। শান্তি কমিটি আর রাজাকার কমান্ডারের বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ক্যাম্পের বাঙ্কারে মাইন পেতে রেখে আসে। ভয় পায় না। বুধার এই যে সাহসী হয়ে বেড়ে ওঠা এবং তারপর মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া- এই দিকটিকে সেলিনা হােসেন চমক্কারভাবে তুলে ধরেছেন এই উপন্যাসে। বুধার চরিত্রের এই বিকাশ তাই খুবই স্বাভাবিক বলে মনে হয়। কিশাের হিসেবে তার মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি এভাবেই যৌক্তিক হয়ে উঠেছে।

কাকতাড়ুয়া উপন্যাসে আরও বেশ কয়েকটি চরিত্র আমরা পাই। তারা খুব বড় ভূমিকা পালন করেনি। তবে উপন্যাসের কাহিনি গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। এই চরিত্রগুলাে হচ্ছে কুন্তি, নােলক বুয়া, হরিকাকু, আহাদ মুন্সি, আলি, মিঠু, ফুলকলি, রাজাকার কুদুস ও মুক্তিযােদ্ধা শিল্পী শাহাবুদ্দিন। এই চরিত্রগুলাে ছাড়া আরও একজনের প্রভাব এই উপন্যাসে স্পষ্ট। সেই মানুষটি হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু। বুধা অনেক সময় যখন মুক্তিযুদ্ধের কথা ভেবেছে, তখনই ছায়ার মতাে তাঁর স্বাধীনতার আহ্বান বুধাকে উদ্দীপ্ত করেছে। সমগ্র উপন্যাসটি নির্মাণ করতে সেলিনা হােসেনকে এসব চরিত্রের সাহায্য নিতে হয়েছে। তিনি এর কাহিনিকে পাঠকের কাছে বিশ্বাসযােগ্য করে তুলেছেন।

উপন্যাসটির ভাষাভঙ্গি, পরিবেশচিত্রণ এবং বর্ণনারীতিও বেশ আকর্ষণীয়। শুরু থেকেই ছােট ছােট বাক্যে, অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে উপন্যাসের কাহিনি গেঁথে তুলেছেন ঔপন্যাসিক সেলিনা হােসেন। বুধা যে মুক্ত মানুষ, সেটা বােঝাবার জন্য যে বর্ণনার আশ্রয় নিয়েছেন, তাও চমকপ্রদ। এ রকম প্রাসঙ্গিক কিছু অংশ:

(ক) পথ ওকে ডাকে আয়। ও হেসে বলে, এই তাে এসেছি। দেখ আমাকে। পথ ওকে দেখে।

(খ) ঘুমুবার জায়গা নেই তাে কী হয়েছে? দোকানের বারান্দা আছে, গাছতলা আছে, হাটের চালা আছে, ঘাটে বাঁধা নৌকা আছে।

(গ) সব বেলার ভাত নেই তাে কী হয়েছে? ফলপাকুড় আছে, নদীর পানি আছে। মােলক বুয়ার মুড়ি ভাজা আছে।

বুধা যে আপন স্বভাবে স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠা এক কিশাের, এই বর্ণনায় আছে তারই ইঙ্গিত। মিলিটারির নির্মম হত্যাকাণ্ড আর যে বর্বরতার দৃশ্য সে দেখেছে, সেই বর্ণনাও সমান আকৰ্ষক:

গুলি। মুখ থুবড়ে পড়ে গেল সালাম চাচা।

গুলি। পড়ে গেল রবিদা।

গুলি। পড়ে যায় একসঙ্গে অনেকে।

ধানগাছের আড়ালে উবু হয়ে বসে থাকতে পারে না ও। ওর শরীর কাঁপে থরথর করে। হাজার হাজার বােলতা ওর কানের চারপাশে উড়তে থাকে। ও পড়ে যায়। ওর শরীর কাদায় মাখামাখি হয়ে যায়।

আবার বুধা যখন মিলিটারিদের বিরুদ্ধে প্রতিশােধ নেওয়ার কথা ভাবে, তখনকার বর্ণনা এ রকম:

ও পলকহীন সৈনিকদের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাবছে। ভীষণ ভাবনায় ও গম্ভীর হয়ে যায়। ভাবে, ওদেরকে তাে একদিন এ গা থেকে চলে যেতে হবে। ওরা যেভাবে এসেছিল সেভাবেই একদিন ফিরে যাবে। ওদেরকে যেতেই হবে। তবে ওদেরকে কি জ্যান্ত ফিরে যেতে দেয়া উচিত?

এখানে পৌছানাের পর ঔপন্যাসিক সেলিনা হােসেন বুধার মধ্য দিয়ে ‘প্রতিশােধ’ গ্রহণের কথা বলেন। এই হচ্ছে লেখকের জীবনভাবনা। অত্যাচারীর বিরুদ্ধে যে রুখে দাঁড়াতে হয়, প্রতিশােধ গ্রহণ করতে হয়, এই ভাবনারই প্রকাশ ঘটেছে এই উপন্যাসে। শুধু বড়রা নন, একজন কিশোেরও যে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারে, এ হচ্ছে সেই কাহিনি। গ্রামের অবহেলিত, প্রান্তিক এক কিশােরের স্বাধীনতা সংগ্রামের গল্প। নতুন প্রজন্মের যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, তারা এই উপন্যাসটি পড়ে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা পাবে। উপন্যাসটির সার্থকতা মূলত এখানে।