কোরবানির চামড়া সংরক্ষণের নিয়ম ২০২১ – বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পশুর চামড়া ছাড়ানো উপায় – ঈদুল আজহা পশু চামড়া দাম।

কোরবানির পর পরই চামড়া সংগ্রহ শুরু হয়ে যায়। কিন্তু এবারের ঈদ ভিন্ন। করোনাকালে কোরবানির সংখ্যা অন্যান্য বারের চেয়ে তুলনামূলক কম। তাছাড়া এবার চামড়া সংগ্রহে তোড়জোরও চোখে পড়ছে না। প্রতি বছর ঈদুল আজহায় স্বাভাবিকভাবে কোরবানির পশু জবাইয়ের পর চামড়া সংগ্রহ করতে বিভিন্ন মাদ্রাসা ও স্থানীয় দাতব্য সংস্থার প্রতিনিধিরা বাড়ি বাড়ি হাজির হয়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। কাজেই যারা চামড়া বিক্রির অপেক্ষায় আছেন বা যারা চামড়া সংগ্রহ করছেন তাদের জন্যে এটাকে সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি জেনে নেয়া অতি জরুরি। এখানে সংক্ষেপে জেনে নেয়া যাক।

পশু চামড়া সংরক্ষণের নিয়মাবলী

  • পশু কেনার পর যেখানে রাখবেন সেখানে খড় বা চট বিছিয়ে দিন যাতে কোনওভাবে পশুর শরীরে আঘাত না লাগে। কেনার সময়ও লক্ষ রাখা উচিত যাতে চামড়ায় কোনও ক্ষতচিহ্ন না থাকে।
  • নাইলন বা প্লাস্টিকের দড়ি অথবা লোহার শিকল দিয়ে পশু বাঁধবেন না। এতে চামড়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পশু বাঁধার জন্য পাটের দড়ি ব্যবহার করতে পারেন।
  • পশুকে এমন ভাবে টানা-হেঁচড়া করবেন না যাতে চামড়া আঘাত লাগে।
  • চামড়া সহজে ছাড়ানোর জন্য জবাইয়ের আগে পশুকে প্রচুর পরিমাণে পানি খাওয়ান।
  • কোরবানির দিন পশুকে ভুসি, খড় বা ঘাস খাওয়াবেন না।
  • পশু কোরবানির জন্য সমতল জায়গা বেছে নিন। আঁকাবাঁকা কিংবা গর্তযুক্ত স্থানে কোরবানি দেবেন না।
  • কোরবানি দেওয়া ও চামড়া ছাড়ানোর জন্য দক্ষ লোক বেছে নেওয়া জরুরি।
  • জবাইয়ের পর পশুকে শক্ত কোনও খুঁটির সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে দিলে চামড়া ছাড়ানো সহজ হয়।
  • খুঁটির সঙ্গে বেঁধে জবাইয়ের দাগ থেকে ধারালো ছুরি দিয়ে ধীরে ধীরে হালকা করে নিচের দিকে টেনে আলাদা করতে হবে চামড়া।
  • চামড়া ছাড়ানোর পর লেগে থাকা রক্ত, চর্বি যত দ্রুত সম্ভব সরিয়ে ফেলুন। না হলে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমনে পচন ধরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে চামড়ায়।
  • পরিষ্কার পানি দিয়ে চামড়া ভালো করে ধুয়ে হালকা রোদে দিন পানি ঝরে যাওয়ার জন্য।
  • চামড়া এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়ার সময় চামড়া টানা-হেঁচড়া করবেন না।
  • চামড়া ছাড়ানোর তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে তা বিক্রি করা না গেলে দ্রুত সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত।
  • লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করা সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি। সংরক্ষণ করার জন্য চামড়ার ধরন বুঝে লবণ লাগাতে হবে। সাধারণত চামড়ার ওজনের বিশ শতাংশ হারে লবণ ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ চামড়ার ওজন ১৫ থেকে ২০ কেজি হলে লবণ ব্যবহার করতে হবে ৩ থেকে ৪ কেজি।
  • চামড়া বিছিয়ে তার উপর লবণ ছিটিয়ে দিলে চামড়ায় থাকা পানি ও ব্যাক্টেরিয়া বের হয়ে আসে। তারপর চামড়া ভালো করে ভাঁজ করে রাখতে হয়। লবণের পর্যাপ্ততা না থাকলে লবণ ও পানির মিশ্রনের সাহায্যেও কিছুদিন চামড়া সংরক্ষণ করা যায়।
  • চামড়া রোদে শুকিয়েও সংরক্ষণ করতে পারেন। খোলা স্থানে বিছিয়ে বা তারের সাথে চামড়া ঝুলিয়ে রোদে শুকিয়ে নেওয়া যায়। তবে দীর্ঘক্ষণ রোদে শুকালে অনেক সময় চামড়ার গুনাগুণ নষ্ট হয়ে যায়। তাই লবণ পদ্ধতিই সবচেয়ে নিরাপদ।
  • চামড়া সংরক্ষণ করতে পারেন হিমাগারেও। ট্যানারিগুলোতে সাধারণত চামড়া সংরক্ষণ করার জন্য হিমাগার থাকে। ব্যাক্টেরিয়া প্রতিরোধক রাসায়নিক দ্রব্যের সাহায্যে সেখানে সংরক্ষণ করা হয় পশুর চামড়া।

কোরবানির চামড়া সংরক্ষণের নিয়ম ২০২১

Kurbani-page-002 Kurbani-page-003

Kurbani-page-004 Kurbani-page-005 Kurbani-page-006 Kurbani-page-007 Kurbani-page-008

Kurbani-page-009 Kurbani-page-010 Kurbani-page-011 Kurbani-page-012

বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পশুর চামড়া ছাড়ানো উপায়

বাণিজ্যিক এবং রফতানী পন্যের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পশুর চামড়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে । চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্যাদি রপ্তানী করে দেশ প্রতি বৎসর কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করে। পশু স¤পদ থেকে জাতীয় আয়ের ১৩ ভাগ এর মধ্যে ১২ ভাগই আসে পশুর চামড়া এবং চামড়াজাত পন্যের মাধ্যমে । চামড়া দেশের সর্বত্রই পাওয়া যায়। পশুর প্রজাতি, জীবন প্রণালী, সঠিক ব্যবস্থাপনা, খাওয়ার অভ্যাস, সাধারণ অবস্থা, রোগ নিয়ন্ত্রন, বয়স, লিংগ ইত্যাদির উপর চামড়ার গুণাগুণ নির্ভর করে। দেশের কোথাও বৈজ্ঞানিক উপায়ে চামড়া ছাড়ানোর যন্ত্রাদি সহ আধুনিক ও সুপরিকল্পিক কোন কসাইখানা নেই। উন্নত মানের চামড়া পেতে হলে কসাইখানায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, পশু জবাই এবং চামড়া ছাড়ানোর জন্য যথেষ্ট জায়গা, জবাইকৃত পশুকে ঝুলিয়ে রক্তপাত ও চামড়া ছাড়ানোর ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ এবং ময়লা নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা থাকা দরকার।

উপরন্ত, জবাই করার পর পশুর চামড়া-ছাড়ানোর পদ্ধতি, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার উপর এর গুণাগুণ নির্ভর করে। চামড়া ছাড়ানোর সময় কসাই-এর দক্ষতার স্বল্পতা, তাড়াহুড়া এবং অসতর্কতার জন্য চামড়ায় যে ছুরির কাটা হয় তাতে চামড়া আংশিকভাবে কিংবা সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তা ছাড়া চামড়া গুদামজাতকরণ, পরিবহন এবং সরবরাহ ব্যবস্থা সেকেলে রীতি অনুযায়ী হয়ে থাকে যা চামড়া বাজারজাতকরণ পদ্ধতিকেই মোটামুটি ভাবে বানচাল করে থাকে। সুতরাং পশুর জীবনদশায় ও জবাই বা মৃত্যুর পরবর্তি সময়ের ক্রুটি সমূহ সম্বন্ধে সাবধানতা অবলম্বন, কসাইখানায় উন্নত যন্ত্রাদির সাহায্যে চামড়া ছাড়ানো এবং চামড়া সংরক্ষণের উপযুক্ত পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগ, চামড়া শিল্পকে উপযোগিতার দিক দিয়ে সর্বাংগীন উন্নত করতে সহায়ক হবে। তাই এহেন অর্থকরী পন্য অজ্ঞতা, অদক্ষতা এবং খাম-খেয়ালাপনার জন্য যাতে নষ্ট না হয় সেদিকে আমাদের সকলের দৃষ্টি রাখা একান— ভাবে প্রয়োজন।এখানে আবারো উল্লেখ্য করা প্রয়োজন যে, সঠিক পদ্ধতিতে চামড়া ছাড়ানো না হলে উপযুক্ত সংরক্ষণ এবং গুদামজাত করণেও চামড়ার গুণগত মানের কোন উন্নতি হবে না এবং এ জন্য কসাই এর সামান্য ধৈর্য, কিছুটা বাড়তি সময়, সঠিকভাবে ছুরি ও চামড়া ছাড়ানোর পদ্ধতি অনুসরণে যে চামড়া পাওয়া যাবে তাতে চামড়া উৎপাদনকারী থেকে শুরু করে দেশ. জাতি এবং সবার জন্য সুফল বয়ে আসবে। গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও অন্যান্য পশু থেকে যে সমস্ত চামড়া পাওয়া যায় তার বেশীর ভাগই ক্রটি পুর্ন অর্থাৎ নিখুঁত এবং দোষমুক্ত নয়। চামড়ার মধ্যে প্রায়শই নিম্নলিখিত ক্রটি গুলি দেখা যায়।

১. চামড়ার নানাস্থানে কাটা
২. ছুরির দাগ
৩. নিয়মমত না কাটা চামড়া
৪. অতিরিক্ত মাংস এবং চর্বি সহ চামড়া
৫. জমাট বাঁধা রক্ত, মাটি, এবং অন্যান্য ময়লাযুক্ত অপরিষ্কার চামড়া
৬. স্থানীয়ভাবে চামড়ার সাময়িক সংরক্ষণে ক্রুটি
৭. বিভিনè ধরনের রোগে আক্রান— চামড়া
৮. পচন ধরা চামড়া

উপরোক্ত কারণে বাজারে চামড়াগুলি কম দামে বিক্রি হয় এবং এগুলি হতে যে পাকা চামড়া তৈরী হয় সেগুলির দামও কম হয়। এইসব ক্রটিপূর্ণ চামড়ার চাহিদা বিদেশে একেবারে নেই বললেই চাল ফলে দেশ প্রতি বছর ৬০০ মিলিয়নেরও বেশি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় থেকে বঞ্চিত হচেছ।

ঈদুল আয্হা নিকটবর্তী। এই সময় ঘরে ঘরে গরু, ছাগল, ভেড়া সহ বিভিনèè পশু কোরবানী করা হয়ে থাকে এবং প্রতি বৎসরে উৎপাদিত মোট চামড়ার ৪০ ভাগই কোরবানীর পশু থেকে পাওয়া যায়। সাধারণত: হৃষ্টপুষ্ট পশুকেই কোরবাণীর জন্য বাছাই করা হয় ফলে চামড়াগুলি অপেক্ষাকৃত উন্নতমানের এবং বড় মাপের হয়। কিন্তু যারা কোরবাণী করেন তাদের অনেকেই চামড়া ছাড়ানোর কাজে অনভিজ্ঞ। তারা পশু থেকে যেনতেনভাবে গোশত বের করেন, চামড়ার দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজন আছে এটা মনে করেন না। ফলে চামড়ার মধ্যে অনেক রকমের ক্রুটি থেকে যায় এবং অবহেলার দরুন অনেক সময় সেগুলিতে পচন ধরে। অতএব এই মূল্যবান জাতীয় সম্পদ যাতে অবহেলা এবং অযতেœ নষ্ট না হয় সেদিকে সকলেরই সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। কোরবাণীকৃত কিন্তু অন্যান্য পশু থেকে কিভাবে চামড়া ছাড়াতে হয় এবং চামড়ায় ছুরি বা কাঁটার দাগ না পড়ে এবং পচনও না ধরে সে সমস্ত নিয়মাবলী সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করার জন্য ঈদুল আয্হার বেশ আগেভাগেই লেখাটি প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হল। ট্যানারিতে পৌছানোর আগে স’ানিয়ভাবে সাময়িক সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার অজ্ঞতার কারনেও চামড়া ব্যপকভাবে নষ্ট হয়। পশুর চামড়ার সাময়িক সংরক্ষণ এবং পরিবহন ব্যবস্থার উপর পরবর্তিতে লেখা প্রকাশের ইচছা রইল।

শেষ কথা

ধন্যবাদ সবাইকে আমাদের সাথে থাকার জন্য।