স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)

দীর্ঘদিনের আলোচনা-সমালোচনার পর অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হলো র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। এর জায়গায় পুলিশ বাহিনীর অধীনে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে “স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬”। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে রাষ্ট্রপতির সম্মতি পাওয়ার পর বাংলাদেশ গেজেটে (অতিরিক্ত সংখ্যা) আইনটি প্রকাশিত হয়েছে, যা “২০২৬ সনের ১০৯ নং আইন” হিসেবে নথিভুক্ত।

চলুন জেনে নেওয়া যাক র‍্যাবের নতুন নাম, নতুন কাঠামো, দায়িত্ব-কর্তব্য এবং সরকারি গেজেট কীভাবে ডাউনলোড করবেন তার বিস্তারিত।

র‍্যাবের নতুন নাম কী হলো এবং কেন এই পরিবর্তন

২০০৪ সালে জঙ্গিবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনের লক্ষ্যে পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট হিসেবে র‍্যাব গঠিত হয়েছিল। তবে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বাহিনীটি বারবার বিতর্কের মুখে পড়ে। এমনকি ২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাব ও এর কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি উঠছিল।

নতুন গেজেট অনুযায়ী, র‍্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশ বাহিনীর আওতাধীন “স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (SRB)” নামে একটি নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা হয়েছে। আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনের মাধ্যমে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত রাখতে পুলিশ বাহিনীকে সহায়তার জন্য আধুনিক, পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক একটি ইউনিট প্রয়োজন। পাশাপাশি এ ধরনের বাহিনীর ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, তদারকি ও কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথাও আইনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে নাম পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে দ্বিমতও রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই আইন পাসের মাধ্যমে র‍্যাব প্রকৃতপক্ষে বিলুপ্ত হচ্ছে এবং এসআরবির সঙ্গে র‍্যাবের কোনো সংস্পর্শ নেই। অন্যদিকে বিরোধী দলের একাংশ এবং বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধু নাম পাল্টালেই মানুষের আস্থা ফিরবে না; বরং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ ও প্রকৃত জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই এখানে আসল চ্যালেঞ্জ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ কয়েকটি সংগঠনও এই পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গেজেট প্রকাশ: কীভাবে ডাউনলোড করবেন (ধাপে ধাপে)

Special Response Battalion (SRB)

সরকারি গেজেট বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ের (বিজি প্রেস) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করে যে কেউ সহজেই “স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (SRB) আইন, ২০২৬”-এর মূল গেজেট কপি ডাউনলোড করতে পারবেন।

ধাপ ১: ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন প্রথমে ব্রাউজারে যান বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট www.dpp.gov.bd/bgpress-এ।

ধাপ ২: “Government Gazettes” মেনুতে যান হোমপেজের বাম পাশের মেনু থেকে Government Gazettes অপশনে ক্লিক করুন।

ধাপ ৩: “Extraordinary Gazette” নির্বাচন করুন মেনুর সাব-অপশন থেকে Extraordinary Gazette (অতিরিক্ত গেজেট) বেছে নিন, কারণ এসআরবি আইনটি অতিরিক্ত সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।

ধাপ ৪: তারিখ অনুযায়ী তালিকা থেকে খুঁজুন ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের তালিকায় গেলে “২০২৬ সনের ১০৯ নং আইন।– স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (SRB) আইন, ২০২৬” শিরোনামটি দেখতে পাবেন। এটি জাতীয় সংসদ কর্তৃক জারি করা এবং পাতা নম্বর ২৪৮২৭-২৪৮৩৮।

ধাপ ৫: পিডিএফ ফাইলে ক্লিক করে ডাউনলোড করুন শিরোনামের উপর ক্লিক করলে সরাসরি পিডিএফ ফাইলটি ওপেন বা ডাউনলোড হয়ে যাবে। ফাইলটিতে আইনের সম্পূর্ণ বাংলা পাঠ, ধারা ও উপধারাসহ সব বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (SRB) গেজেট PDF

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) এর কাজ কী

নতুন আইনের তৃতীয় অধ্যায়ে এসআরবির দায়িত্ব ও কার্যাবলি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত র‍্যাবের আগের অনেক দায়িত্বই এসআরবিতে বহাল রাখা হয়েছে, তবে জবাবদিহিতার কাঠামো নতুন করে সাজানো হয়েছে। এসআরবির প্রধান কার্যাবলির মধ্যে রয়েছে—

  • জননিরাপত্তা রক্ষা করা
  • সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন করা
  • বেআইনি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা
  • মাদক, সাইবার অপরাধ, গুম ও ভূমি দস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া
  • নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানবপাচার, অপহরণসহ মানবতাবিরোধী কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা
  • আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা
  • অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া
  • আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে নির্দিষ্ট অপরাধ সংক্রান্ত তদন্ত পরিচালনা করা
  • সরকার কর্তৃক অর্পিত অন্যান্য আইনসংগত দায়িত্ব পালন করা

এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ থাকবে এবং তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনায় ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ প্রবিধান অনুসরণ করতে হবে। বাহিনীটির সদর দপ্তর থাকবে ঢাকায়, আর সার্বিক নেতৃত্বে থাকবেন একজন মহাপরিচালক, যিনি বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে সরকার কর্তৃক নিযুক্ত হবেন। পুরো ইউনিট পরিচালিত হবে পুলিশ মহাপরিদর্শকের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে।

জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আইনে একটি “অভিযোগ প্রতিকার কমিটি” গঠনের বিধানও রাখা হয়েছে, যেখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ অধিদপ্তর, বিচার বিভাগ ও মানবাধিকার ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ প্রতিনিধিরা থাকবেন। এই কমিটি সাধারণ মানুষের অভিযোগ এবং ইউনিটের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ-অসন্তোষ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে।

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) কিভাবে চাকরি পাবেন

এসআরবিতে চাকরির বিষয়ে অনেকের মনে কৌতূহল থাকলেও এটি বোঝা জরুরি যে, র‍্যাবের মতোই এসআরবিতেও সরাসরি কোনো নিয়োগ পরীক্ষা বা আবেদন প্রক্রিয়া নেই। আইন অনুযায়ী, সরকার প্রয়োজন অনুসারে পুলিশ বাহিনী, বিভিন্ন শৃঙ্খলা বাহিনী (যেমন সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি ইত্যাদি) এবং নির্ধারিত সংখ্যক কর্মকর্তা ও আর্মড পার্সোনেলকে পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এই ইউনিট গঠন করবে। অর্থাৎ, ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট বাহিনীতে কর্মরত সদস্যদেরই একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য এসআরবিতে সংযুক্ত করা হবে।

তবে যাঁরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে ক্যারিয়ার গড়তে চান এবং ভবিষ্যতে এসআরবির মতো বিশেষায়িত ইউনিটে কাজের সুযোগ পেতে আগ্রহী, তাঁদের জন্য কিছু সাধারণ পথ রয়েছে—

  • বাংলাদেশ পুলিশে নিয়োগ: কনস্টেবল, এসআই বা সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে বাংলাদেশ পুলিশ বা বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (বিসিএস পুলিশ ক্যাডার) নিয়মিত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া, যা পরবর্তীতে প্রেষণে এসআরবিতে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
  • সশস্ত্র বাহিনীতে যোগদান: সেনা, নৌ বা বিমানবাহিনীতে চাকরির মাধ্যমে যোগ্যতা অর্জন করলে ভবিষ্যতে প্রেষণে এসআরবিতে সংযুক্তির সম্ভাবনা থাকে।
  • প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা অর্জন: আইন অনুযায়ী ইউনিটে যোগদানের পর নির্ধারিত মেয়াদে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ নিতে হয়, তাই শারীরিক সক্ষমতা, শৃঙ্খলাবোধ ও পেশাগত দক্ষতা আগে থেকেই গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ।
  • নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির জন্য নজর রাখা: ভবিষ্যতে বিধিমালা প্রণয়নের পর পদায়ন-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট শর্তাবলি ও পদ্ধতি প্রকাশ হতে পারে, তাই বাংলাদেশ পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে নজর রাখা ভালো।

সংক্ষেপে বলা যায়, র‍্যাবে যেমন সরাসরি নিয়োগের কোনো ব্যবস্থা ছিল না, এসআরবির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম বহাল থাকছে বলে গেজেট থেকে বোঝা যায়। আগ্রহীদের প্রথমে নিজ নিজ মূল বাহিনীতে (পুলিশ বা শৃঙ্খলা বাহিনী) যোগ দিয়ে যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।

আইনি কাঠামোর কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক

  • এই আইন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০০৩ সালের সংশোধনী আইনের মাধ্যমে র‍্যাব গঠন সংক্রান্ত পুরনো বিধান রহিত হয়ে যাবে।
  • র‍্যাবের বিদ্যমান জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, তহবিল, ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, নথিপত্র ইত্যাদি সরাসরি এসআরবির অনুকূলে স্থানান্তরিত হবে।
  • নতুন বিধিমালা জারি না হওয়া পর্যন্ত পুরনো র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (কোর্ট পদ্ধতি ও বিভাগীয় কার্যধারা) বিধিমালা, ২০০৫ প্রযোজ্য থাকবে।
  • আইনের বাংলা ও ইংরেজি পাঠের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে বাংলা পাঠই চূড়ান্তভাবে প্রাধান্য পাবে।

এসআরবি গঠনের মধ্য দিয়ে র‍্যাবের বিতর্কিত অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও, বাহিনীটি বাস্তবে কতটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলকভাবে কাজ করবে তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতে প্রণীত বিধিমালা এবং প্রয়োগের ওপর। এ বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Posted on: September 17, 2026

Categories: News