হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর মদিনা জীবনে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা এবং সমাধান

2.16K viewsইসলাম
0

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর মদিনা জীবনে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা ও এর সমাধানের উপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করাে। এইচএসসি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রথম পত্র চতুর্থ সপ্তাহের এসাইনমেন্ট ২০২১ সমাধান।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর মদিনা জীবনে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা ও এর সমাধানের উপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করাে।

স্তর: এইচএসসি পরীক্ষা ২০২১, বিভাগ: মানবিক, বিষয়: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ১ম পত্র, বিষয় কোড: ২৬৭, মোট নম্বর: ১৬, অ্যাসাইনমেন্ট নম্বর: ০৩, দ্বিতীয় অধ্যায়: হযরত মুহাম্মদ (স:)।

অ্যাসাইনমেন্ট: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর মদিনা জীবনে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা ও এর সমাধানের উপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করাে।

শিখনফল/বিষয়বস্তু

  • ১. মদিনা সনদ ও মদিনায় আদর্শ রাষ্ট্রগঠনে এর গুরুত্ব বিশ্লেষণ করতে পারবে;
  • ২. মহানবি (স:) এর সময়ের বিভিন্ন যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল ব্যাখ্যা করতে পারবে;
  • ৩. হুদায়বিয়ার সন্ধির পটভূমি, শর্তাবলি ওতাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে পারবে;
  • ৪. মক্কা বিজয়ের ঘটনা বর্ণনা করতে পারবে এবং এখানে প্রতিফলিত শান্তিনীতির ধারণা ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে প্রয়ােগ করতে অনুপ্রাণিত হবে।

নির্দেশনা (সংকেত/ধাপ/পরিধি):

  • ক) মদিনা সনদ ও এর তাৎপর্য ব্যাখ্যা;
  • খ) বদর ও উহুদ যুদ্ধের ফলাফল বিশ্লেষণ;
  • গ) ইসলামের প্রসারে হুদায়বিয়ার সন্ধির গুরুত্ব পর্যালােচনা;
  • ঘ) রক্তপাতহীন মক্কা বিজয়ে শান্তি নীতির ধারণা ব্যাখ্যা;

এইচএসসি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি চতুর্থ সপ্তাহের এসাইনমেন্ট ২০২১ সমাধান

হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর মদিনা জীবনে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা এবং সমাধান

হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর মদিনা জীবনে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা এবং সমাধান হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর মদিনা জীবনে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা এবং সমাধান

হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর মদিনা জীবনে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা এবং সমাধান হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর মদিনা জীবনে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা এবং সমাধান হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর মদিনা জীবনে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা এবং সমাধান

হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর মদিনা জীবনে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা এবং সমাধান হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর মদিনা জীবনে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা এবং সমাধান হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর মদিনা জীবনে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা এবং সমাধানGet HSC Islamic History and Culture Assignment Answer

এসাইনমেন্ট সমাধান বা যেকোনো প্রয়োজনে-

হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর ইসলাম মদিনা জীবনে প্রচারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা এবং সমাধান

ক) মদিনা সনদ ও এর তাৎপর্য

মদিনা সনদের পরিচয়

হযরত মুহাম্মদ (স:) ছিলেন বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক। তিনি তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার দ্বারা অবলোকন করলেন যে, মদিনা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী ইহুদী, খ্রিস্টান, পৌত্তলিক ও মুসলিমদের মধ্যে সহাবস্থান এবং সম্প্রীতি স্থাপিত না হলে একটি সুসংহত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই তিনি এ চার জাতির লোক নিয়ে একটি ‘আন্তর্জাতিক সনদ’ রচনা করেন। এ সনদের ৪৭টি ধারা ছিল। এ সনদকেই “মদিনা সনদ” বা ““The charter of madina”” বলা হয়। 

মদিনা সনদের তাৎপর্য

ইসলামের ইতিহাসে মদিনা সনদের গুরুত্ব ও তাৎপর্য ব্যাপক। যে সকল অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য মদিনা সনদকে পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র বা সংবিধান বলা হয়, 

সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধানঃ ইতোপূর্বে সমগ্র বিশ্বের কোথাও বিধিবদ্ধ আইনের শাসন ছিল না। শাসকদের মুখোচ্চারিত বাণীই ছিল আইন। বিশ্বের ইতিহাসে মদিনার সনদই সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান।

ডঃ হামিদুল বলেনঃ “মোট ৫২টি ধারাবিশিষ্ট এ সনদটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র।”

ইসলামি সাধারণতন্ত্রের ভিত্তিঃ এ সনদের দ্বারা আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করা হয়। রাষ্ট্র ও ধর্মের সহাবস্থানের ফলে ঐশীতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত মদিনা সনদই ইসলামি সাধারণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করে।

উদারতার ভিত্তিতে জাতি গঠনঃ এ সনদের মাধ্যমে মহানবী (স:) সকল ধর্ম ও জাতির ব্যাপারে যে উদার নীতি গ্রহণ করেন, তা বিশ্বের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। পরমত ও পরধর্ম রেখে এ সনদ এক বৃহত্তম জাতি গঠনের পথ উন্মুক্ত করে।

ইসলামের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধিঃ এ সনদের ফলে মদিনা রাষ্ট্রে ইসলামের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। মূলত এ সনদই অদূর ভবিষ্যতের বিশ্বব্যাপী ইসলামি সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়। ঐতিহাসিক হিট্টি বলেন, “মদিনা রাষ্ট্রেই পরবর্তী কালের বৃহত্তম ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল স্থাপন করে।”

মহানবীর (স:) শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকৃতিঃ মদিনা সনদের বদৌলতে মহানবী (স:) মদিনা রাষ্ট্রের সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদা ও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তাঁর হাতেই ছিল মদিনার চূড়ান্ত চাবিকাঠি।

মদিনা রাষ্ট্রের সংহতিঃ এ সনদ সংঘর্ষ বিক্ষুদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন ইয়াসরিববাসীকে সুসংহত করে এবং মদিনা রাষ্ট্রের পুনর্গঠন, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধশালী করণে বিরাট অবদান রাখে। মূলত এ সনদ ছিল রণ উম্মাদ আরব জাহানের শান্তি ও সহাবস্থান এবং সম্প্রীতি স্থাপনের এক মহাপরিকল্পনা। তাই ঐতিহাসিক ওয়েল হাউছেন বলেন, “এ সংবিধানই অরাজকতাপূর্ণ একটি নগরকে রাষ্ট্রের মর্যাদায় উন্নীত করে।”

যুগান্তকারী মহানায়কঃ মহানবী (স:) যে নিছক একজন ধর্ম প্রচারকই নন; বরং বিশ্বের একজন শ্রেষ্ঠ রাজনীতিক, কুটনীতিক ও বিপ্লবী মহাপুরুষ ছিলেন তা এ সনদে প্রমাণিত হয়। ঐতিহাসিক উইলিয়াম ম্যুর যথার্থ বলেছেনঃ (The prophet) his real greatness- a master mind not only of his own age but of all ages.” “হযরতের (স:)

বিরাট ব্যক্তিত্ব ও অপূর্ব মননশীলতা শুধু তৎকালীন যুপেরই নয়; বরং সর্বযুগের ও সর্বকালের মহামানবের জন্য শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক।

ইসলামের প্রসারতা বৃদ্ধিঃ এ সনদের মাধ্যমে ইসলামের প্রসারতা ও শক্তি বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।

স্থিতিস্থাপক সংবিধানঃ মদিনার সনদটি ছিল খুবই স্থিতিস্থাপক। রাসূল (স:)-এর জীবদ্দশাতেই সমগ্র আরবের লোকেরা ইসলাম ধর্ম কবুল

করে। সে দিনের নগর রাষ্ট্র পরিণত হয় একটি বিশাল বিস্তৃত সাম্রাজ্যর যা পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রয়োজন মেটাতে সমর্থ হয়।”

খ) বদর ও উহুদ যুদ্ধের ফলাফল

বদর যুদ্ধের ফলাফল

মীমাংসাকারী যুদ্ধ: বদর যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে এক চূড়ান্ত যুগান্তকারী ঘটনা। এ চূড়ান্তকারী যুদ্ধে জয়লাভ না করলে ইসলাম পৃথিবীর বুক হতে চিরতরে মুছে যেত। মিথ্যার ওপর সত্যের, অজ্ঞতার ওপর জ্ঞানের জয় অবশ্যম্ভাবী; বদর যুদ্ধে জয়লাভ তাই প্রমাণিত হল।

পরবর্তী বিজয়ের পথপ্রদর্শক: বিশাল কুরাইশ বাহিনীর ওপর মুষ্টিমেয় মুসলিম বাহিনীর এ বিজয় মুসলমানদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে

পরবর্তী সকল বিজয়ের ফলক উম্মোচন করল। 

কুরাইশদের দম্ভ খর্ব ও ইসলামের গৌরব বৃদ্ধি: এতে কুরাইশদের গগন চুম্বী দম্ভ-খর্ব এবং সকল প্রকার অহংকার ধুলিস্যাৎ হয়। এ যুদ্ধে পরাজয় মক্কাবাসীদের গৌরব ও প্রতিষ্ঠার মূলে চরম আঘাত হানে। পক্ষান্তরে ইসলামের গৌরব ও শক্তি মদিনায় এবং মদিনার বাইরে বহুগুণে বৃদ্ধি পেতে লাগলো। যে ধর্ম এতদিন আÍরক্ষার চিন্তায় শঙ্কিত থাকত, সেই ধর্ম তখন বরং হামলা করার মত শক্তি সঞ্চয় করল।

হযরত মুহাম্মদ (স:)-এর শক্তিবৃদ্ধি: বদরের যুদ্ধ মুসলমানদের কাছে শুধু একটি যুদ্ধ নয়। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। এই যুদ্ধ মুহাম্মদের (স:) মর্যাদা ও শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। এ জয়ের ফলে মহানবীর (স:) বৈষয়িক শক্তির ভিত্তি স্থাপিত হয়। ঐতিহাসিক হিট্টি বলেন, “সামরিক লড়াই হিসেবে বদরের যুদ্ধ যতই ছোট হোক না কেন, এতে হযরত মুহাম্মদ (স:) এর পার্থিব শক্তির ভিত্তি স্থাপিত হয়।”

অর্থনৈতিক লাভ: বদরে মুসলমানরা প্রচুর গনীমাতের মাল লাভ করে এবং যুদ্ধবন্দী পণ দ্বারা আর্থিক দিক দিয়ে লাভবান হয়, যা একটি উদীয়মান শক্তির প্রয়োজন ছিল। এ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাক্রম ইসলাম বিস্তারের বাহন হয়ে দাঁড়ায় এবং মুসলিম বাহিনী শত্র“বাহিনীর পরিত্যক্ত অস্ত্র-শস্ত্র, ঘোড়া, উট ও আরও অনেক মূল্যবান বস্তু লাভ করে। এ সমস্ত পণ্য দ্রব্য মুসলমানদের শক্তিবৃদ্ধিতে যথেষ্ট সাহায্য করল।

ইহুদি ও বেদুঈনের ওপর প্রভাব: এ যুদ্ধ ইহুদি ও আরবের বেদুঈনের প্রতি বেশি প্রভাব বিস্তার করে। তারা বুঝতে পারে যে, ইসলাম এক অজেয় শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। ইয়াহুদী ও বেদুঈন জাতিও ইসলামের শক্তি সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা লাভ করল। তারা শত্র“তা ত্যাগ করল না বটে। কিন্তু মুসলমানদেরকে আর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে সাহস পেল না।

রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার সূচনা: বদর যুদ্ধ মুসলমানদের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভিত্তি স্থাপন করে।

নবযুগের সূচনা: মানবতার ইতিহাসে বদর যুদ্ধ নবযুগের সূচনা করেছে। মহানবী (স:) উদারতায় মুগ্ধ হয়ে বন্দীদের অনেকেই ইসলামের ছায়াতলে আসে।

আÍবিশ্বাসের সৃষ্টি: বদর যুদ্ধে মুসলমানগণ জয়লাভ করে ধর্মীয় আবেগ ও অনুভ‚তিতে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। ধর্মের জন্য প্রাণদানের দৃঢ় সংকল্পই পরবর্তীকালে মুসলমান জাতিকে অজেয় করে তুলেছিল। বদরের সফলতা মুসলমানদের মধ্যে এ আÍবিশ্বাস সৃষ্টি করে যে, ইসলামের শক্তির সম্মুখে যে কোন শক্তি পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য।

নিয়ম-শৃঙ্খলা ও ঈমানী শক্তির বিজয়: অপূর্ব কর্তব্যপরায়ণতা, অতুলনীয় নিয়ম-শৃ´খলা, বীরত্ব-বিক্রম এবং অটুট ঈমানী শক্তিতেই মুসলমানগণ সর্বক্ষেত্রে জয়লাভ করেছেন।

উহুদ যুদ্ধের ফলাফল

ঈমান ও বিশ্বাসের পরীক্ষা: উহুদের পরাজয় অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও আÍকলহের ফল নয়; বরং এটা ছিল ঈমানের অগ্নিপরীক্ষা। কারণ নিরবচ্ছিন্ন বিজয় কোন জাতির ভাগ্যেই জোটে না, বরং বিজয়ের আনন্দ ও পরাজয়ের ঘানিকে সঙ্গী করেই বৃহত্তর সাফল্যের পথে এগোতে হয়। এজন্যই প্রয়োজন ধৈর্য ও ঈমানের। কুরাইশদের বিজয় দেখে মুসলমানরা হতাশ হয়ে গেলে আল্লাহ ইরশাদ করেন- “তোমারা ভয় পেয়ো না, চিন্তিত হয়ো না, যদি তোমরা মু‘মিন হও, তাহলে তোমাদের বিজয় আসবেই।”

মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধি: এ যুদ্ধে মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধি পায়। পরাজয়ের পরই তাঁরা তাঁদের ভুল বুঝতে পেরে যুদ্ধ বিধ্বস্ত হওয়ার পরও কুরাইশ বাহিনীকে ধাওয়া করেছিলেন।

মুনাফিক ও মু‘মিন চিহ্নিতকরণঃ

এ যুদ্ধের ফলে মুসলমানদের কাছে মুনাফিক ও মু‘মিন কারা তা চিহ্নিত হয়ে গেল।

ইহুদীদের বহিষ্কার:

এ যুদ্ধের ফলে বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে ইয়াহুদীদের দু‘টি গোত্র বানু কাইনুকা ও বানু কুরায়যা পর্যায়ক্রমে মদিনা হতে বিতাড়িত হয়। 

জয়-পরাজয়ে সন্তুষ্ট থাকার শিক্ষা: এ যুদ্ধের পর জানা গেল নেতার আনুগত্য না মানলে কী করুণ দশা হতে পারে। আর জয়-পরাজয় সকল অবস্থাতেই আল্লাহর আনুগত্য ও সন্তুষ্ট থাকাই হচ্ছে খাঁটি মু‘মিনের কর্তব্য।

সুশৃংখল জাতিতে পরিণত: উহুদের বিপর্যয় মুহূর্তেই সংঘবদ্ধ হয়ে মুসলমানরা নিজেদের নবীকে রক্ষা করেন। উহুদের বিপর্যয়ই মুসলমানদের সুশৃংখল সামরিক জাতিতে পরিণত করে। 

গ) হুদায়বিয়ার সন্ধির গুরুত্ব

ইসলামের ইতিহাসে হুদাইবিয়ার এ ঐতিহাসিক সন্ধি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ যুগান্তকারী ঘটনা তা নিম্নে

বিশ্লেষণ থেকে বুঝা যাবেঃ

১. মহা বিজয়

সন্ধির শর্তাবলী আপাত মুসলমানগণের স্বার্থবিরোধী মনে হলেও এরই মধ্যে নিহিত ছিল মুসলমানদের নিকট ভবিষ্যতের মক্কা বিজয়সহ বিশ্ব-বিজয়ের মন্ত্রবাণী। এজন্যই মহান প্রভু একে “ফাতহুম মুবীন” বা মহাবিজয় বলে ঘোষণা দেন।

২. রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় মর্যাদা বৃদ্ধি

এ সন্ধি মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় মর্যাদা বৃদ্ধি করে এবং প্রথমবারের মত তাদেরকে একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় রাজনৈতিক সংস্থা রূপে লিখিতভাবে স্বীকার করে নেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক ইমামুদ্দীন বলেন- “চুক্তিটি মুসলমানদেরকে একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় রাজনৈতিক সংস্থারূপে স্বীকৃতি দেয়।”

৩. যুদ্ধাবসান

সন্ধির ফলে ক্রমাগত যুদ্ধংদেহী মনোভাবের অবসান ঘটে। হিট্টির মতে- “এ সন্ধি নিজ গোত্র কুরাইশদের সঙ্গে হযরত মুহাম্মদ (স:)-এর যুদ্ধ বিরতির সূচনা করে। ফলে মহানবীর (স:) নেতৃত্বে মুসলিমগণ নিজেদেরকে সুসংহত ও প্রশিক্ষিত শক্তিরূপে গড়ে তুলতে পারেন।”

৪. মদিনা রাষ্ট্রের সংহতি

হুদাইবিয়ার সন্ধির ফলে মদিনার শিশু রাষ্ট্রটি শান্তি ও স্বস্তির ভাব ফিরে পায়। মহানবী (স:) মুসলিমদেরকে ধর্মীয় শিক্ষাদানের সুযোগ লাভ করেন। এতে অভ্যন্তরীণ শৃ´খলা ও সংহতি গড়ে উঠে।

৫. ইসলাম ধর্মের বিস্তৃতি

এ সন্ধির ফলেই মক্কা ও মদিনার জনগণের মধ্যে পুনঃ যোগসূত্র স্থাপিত হয়। মুসলিমগণ ইসলামের দাওয়াত সারা আরবে ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ পান। সারা আরবের লোকদের সাথে মেলা-মেশার সুযোগে ইসলামের অনিন্দ্য সুন্দর আদর্শের প্রতি সকল শ্রেণীর জনতা আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। ইসলামের সুশীতল পতাকা তলে আশ্রয় গ্রহণের হার দ্রুত বেড়ে যায়। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ এবং আমর ইবনুল আস-এর মত সেরা ব্যক্তিত্ব এ সময় ইসলাম গ্রহণ করেন।

ইবনে হিশাম বলেন- “The result of this reaty is that where as Muhammad (sm) went forth to Hudibiyah with only 1400 men, he was followed two years later in the attack on Makkah by ten thousand.” অর্থাৎ মুহাম্মদ (স:) যেখানে ১৪০০ লোক নিয়ে হুদাইবিয়াতে গিয়েছিলেন, সেখানে মাত্র দু’বছর পরে ১০,০০০ লোক নিয়ে মক্কা বিজয় করলেন।”

৬. আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসলাম বিস্তার

হুদাইবিয়ার সন্ধির পর ইসলাম আরবের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিস্তার লাভ করে। মহানবী (স:) এ সময় নির্বিঘ্নে প্রতিনিধি প্রেরণের মাধ্যমে ইসলামের সুমহান বাণী সমগ্র আরবসহ বহির্বিশ্বে পৌঁছে দেন। ঐতিহাসিক জে, বি, বুরি বলেন- “এ সন্ধির ফলে রাসূল (স:) ইসলামের প্রসার সংগঠিত রূপ দেয়ার জন্য রোম, পারস্য, মিশর প্রভৃতি

দেশে দূত প্রেরণ করতে সক্ষম হন। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিয়ে হযরত মুহাম্মদ রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস, পারস্য-সম্রাট খসরু, মিসরের শাসনকর্তা, সুকান্তকাস, আবিসিনিয়ার নাজ্জামী প্রমুখ রাজার নিকট দূত প্রেরণ করেন। অনেক রাজা-বাদশাহ হযরতের পত্র পেয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

৭. আর্থ-সামাজিক পরিমণ্ডলে

হুদাইবিয়ার এ সন্ধি মুসলমানদের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো মজবুত করতে সুযোগ এনে দেয়। যুদ্ধ বিরতির কারণে মুসলমানগণ অবাধে বর্হিবাণিজ্য এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে মনোনিবেশের সুযোগ পায়। এ সময় তারা বিধ্বস্ত আর্থ-সামাজিক অবস্থাকে চাঙ্গা করে তোলে।

৮. মক্কা বিজয়ের সূচক

এ সন্ধি মক্কা বিজয়ের সূচনা করে সমগ্র আরব বিশ্বে ইসলামকে বিজয়ী শক্তিরূপে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। হুদাইবিয়ার এ সন্ধিতে কুরাইশগণ প্রকৃত অর্থে মোটেই লাভবান হয়নি। ৬২৮ খ্রিঃ হতে ৬৩০ খ্রিঃ পর্যন্ত মাত্র দু’বছরের মধ্যেই সন্ধির সুফল মুসলমানদের অনুক‚লে এত ব্যাপক শক্তি ও সাফল্য বয়ে এনেছিল যে, কুরাইশগণ বিচলিত না হয়ে পারেনি

এবং সন্ধি ভঙ্গ করা ছাড়া তাদের গত্যন্তর ছিল না। এ সুযোগে মহানবী (স:) ১০ হাজার মুসলমান নিয়ে মক্কা জয় করে নেন। আর এ থেকেই যাত্রা শুরু হয় মুসলমানদের বিশ্ব বিজয়ের।

৯. কুরাইশদের মানসিক দুর্বলতা

এসন্ধিতে মুসলমানদের সাহসিকতাও দৃঢ়চিত্ততার পরিচয় পেয়ে কুরাইশরা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। তাদের এ দুর্বলতাই মুসলমানদের জন্য পরবর্তী সময়ে মক্কা বিজয়ের ভিত্তি রচনা করে।

১০. রাসূলের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ

সন্ধির ফলে সমগ্র আবরবাসীর কাছে রাসূলের (স:) শ্রেষ্ঠত্ব ও দূরদর্শিতা প্রমাণিত হয়েছিল। বিশ্বকোষের পরিভাষায়, “আপাত দৃষ্টিতে মনে হলো মুহাম্মদ (স:) অপমানজনকভাবে পশ্চাদপসারণ করেছেন। কিন্তু পরোক্ষভাবে এটা শীঘ্রই প্রকাশ পেলো, সুবিধাগুলো তাঁর দিকেই ছিলো। সত্যই তা ছিল কৌশলপূর্ণ পশ্চাদপসারণ কিন্তু রণচাতুর্যপূর্ণ বিজয়।” ঐতিহাসিক ওয়াট্স বলেন- “হুদাইবিয়ার সন্ধি মহানবী (স:)-এর রাজনৈতিক বিচক্ষণতার একটি শ্রেষ্ঠ দলিল।” 

ঘ) মক্কা বিজয় ও শান্তি নীতি

ক. মহানবী (স:)-এর প্রস্তুতি

দূতের কাছে সব কিছু শুনে হযরত মুহাম্মদ (স:) বুঝতে পারলেন, কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ করা ছাড়া উপায় নেই। তিনি অবিলম্বে মক্কা অভিযানের প্রস্তুতি নিলেন। মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ গোত্রসমূহকে দূত মারফত প্রস্তুত হয়ে আসতে নির্দেশ দিলেন। মক্কাবাসীরা যাতে এ খবর জানতে না পারে সে জন্য পূর্ণ সাবধানতা অবলম্বন করা হল। অষ্টম হিজরির ১৮ই রমযান মহানবী (স:) ১০ হাজার সাহাবীকে সাথে নিয়ে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করলেন। মদিনা বাহিনী যথা সময়ে মক্কার নিকটবর্তী সরবরাজ জহরান উপত্যকায় উপস্থিত হয়ে শিবির স্থাপন করল। আরবদের তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী রাসূল (স:) সেনাবাহিনীকে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আগুন জ্বালানোর নির্দেশ দিলেন। এতে সমগ্র মরুভ‚মি ঝলমল করে উঠল। কুরাইশ প্রধানগণ এ দৃশ্য দেখে আঁতকে উঠল।

খ. মক্কার দিকে অগ্রসর

সোবেহ সাদেকের সঙ্গে সঙ্গে মরু উপত্যকা আযানের ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল। মুসলিম বাহিনী শয্যা ত্যাগ করল এবং জামায়াতে ফজর নামায আদায় করল। নামায শেষেই যাত্রার আদেশ হল, ইসলামি সেনাগণ মক্কা অভিমুখে অগ্রসর হল।

গ. আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণ

মরুভ‚মি ঝলমল করে উঠায় তথ্য জানতে এসে প্রহরী সৈন্য কর্তৃক আবু সুফিয়ান ধৃত হন। মহানবী (স:) আবু সুফিয়ানকে ক্ষমা করে দেন, অবশেষে আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করে। মুসলমানদের বিশাল বাহিনী দেখে আবু সুফিয়ানের হৃদকম্পন শুরু হয়। সে মহানবী (স:)-কে বলে“মুহাম্মদ (স:) তুমি কি তোমার স্বজনদেরকে (মক্কাবাসী) হত্যা করতে নির্দেশ দিয়েছ?” হযরত (স:) উত্তর দিলেন না কখনই নয়। অতঃপর মহানবী আবু সুফিয়ানকে বললেন- আবু সুফিয়ান তুমি গিয়ে মক্কাবাসীদের অভয় দাও- আজ তাদের প্রতি কোন কঠোরতা হবে না, তুমি আমার পক্ষ থেকে ঘোষণা করে দাওঃ

১। যে ব্যক্তি আÍসমর্পণ করবে, অথবা

২। কাবায় প্রবেশ করবে

৩। যারা নিজেদের গৃহ দ্বার বন্ধ করে রাখবে অথবা

৪। যারা আবু সুফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে, তাদেরকে অভয় দেয়া হল।

ঘ. মক্কায় মুসলিম বাহিনী

মক্কায় পৌঁছে রাসূল (স:) ইসলামের বিজয় পতাকা হনুজ নামক স্থানে উড্ডীন করতে নির্দেশ দিলেন। সৈন্যগণকে নিয়ে উচ্চভ‚মির দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য হযরত খালেদ (রা) কে আদেশ দিলেন। মহানবী (স:) ঘোষণা করলেন, যতক্ষণ কেউ তোমাদের সঙ্গে লড়াই না করবে তোমরা লড়াই করবে না।

ঙ. সামান্য যুদ্ধ

আবু জাহলের পুত্র ইকরামা ও সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া সসৈন্যে তীর নিক্ষেপ আরম্ভ করল। এতে কুরুজ ইবনে জাবের ফেহরী ও খুনাইজ ইবনে খালেদ (রা) শহীদ হলেন। ফলে হযরত খালেদ ইবনে ওলীদ প্রতিশোধ গ্রহণ শুরু করলেন। যুদ্ধ বেঁধে গেল। মুসলমানগণ কাফিরদের মারতে মারতে মসজিদের দরজায় গিয়ে পৌঁছল, এতে ২৪ জন কাফির নিহত হল।

চ. মহানবী (স:)-এর শুকরিয়া আদায়

মহানবী (স:) মক্কায় প্রবেশ করার পর আল্লাহর দরবারে সিজদায় পড়ে শুকরিয়া আদায় করলেন। খানায় কা’বার চতুর্দিকের এবং ভিতরের মূর্তি অপসারণ করা হল। অতঃপর মহানবী (স:) কা’বা অভ্যন্তরে প্রবেশ করে নামায পড়লেন অথবা তাকবীর দিলেন। মহাসমারোহে আল্লাহর ঘরে অগণিত মানুষ নামায আদায় করল। মহানবী (স:) কুরআনের বাণী ঘোষণা করলেন- “সত্য সমাগত, মিথ্যা অপসৃত আর মিথ্যার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী।” 

Changed status to publish
Add a Comment
Write your answer.